Blog 3
আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে ২০ বছর বয়সে বিলিয়নিয়ার হওয়ার গল্পকে সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি ধরা হয়। সিলিকন ভ্যালির জাকারবার্গ বা স্টিভ জবসের তরুণ বয়সের গল্প আমাদের তরুণদের দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে। কিন্তু ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি এবং নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির কেলগ স্কুল অব ম্যানেজমেন্ট-এর গবেষকদের করা “এইজ এন্ড হাই গ্রোথ এন্টারপ্রেনারশিপ” শীর্ষক এক যুগান্তকারী গবেষণায় দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৭ লাখ স্টার্ট-আপ ফাউন্ডারদের ডেটা বিশ্লেষণ করে তারা দেখেছেন, সফল উদ্যোক্তাদের গড় বয়স ৪৫ বছর। এই গবেষণার অন্যতম লেখক পিয়েরে আজোলে স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, তরুণদের চেয়ে অভিজ্ঞদের ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির হার অনেক বেশি। আমাদের বাংলাদেশেও এখন এই পুরনো ধ্যান-ধারণা ভাঙার সময় এসেছে।
তরুণদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান বা সাহস বেশি থাকতে পারে, কিন্তু তাদের অভাব থাকে ‘ইন্ডাস্ট্রি নলেজ’-এর। বাংলাদেশে একটি ব্যবসা দাঁড় করাতে গেলে কেবল আইডিয়া থাকলেই চলে না, প্রয়োজন হয় সাপ্লাই চেইন বোঝা, সরকারি দপ্তরের মারপ্যাঁচ সামলানো এবং গভীর নেটওয়ার্ক। গবেষণায় যাকে বলা হচ্ছে ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল’।
একজন মধ্যবয়সী মানুষ তার ২০ বছরের কর্মজীবনে যে চড়াই-উতরাই দেখেন, তা কোনো এমবিএ ডিগ্রি বা ইউটিউব টিউটোরিয়াল দিতে পারে না। বাংলাদেশে যারা গার্মেন্টস, আবাসন বা ফিনটেক খাতে সফল হয়েছেন, তাদের পেছনের গল্প খুঁজলে দেখবেন তারা দীর্ঘকাল অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করে খুঁটিনাটি শিখে তবেই মাঠে নেমেছেন।
ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ-এর প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে গবেষক পিয়েরে আজোলে এবং জে. ড্যানিয়েল কিম যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৭ লাখ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ব্যবসার প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি তাদের প্রতিষ্ঠাতাদের গড় বয়স ছিল ৪৫ বছর। তারা প্রমাণ করেছেন যে, ৫০ বছর বয়সী একজন উদ্যোক্তার সফল হওয়ার সম্ভাবনা ৩০ বছর বয়সীর চেয়ে প্রায় ১.৮ গুণ বেশি। এই গবেষণার মূল ভিত্তি হলো ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল’ বা মানব পুঁজি—যা কেবল অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব।
বাংলাদেশেও আমরা এর প্রতিফলন দেখি। আমাদের দেশের তৈরি পোশাক শিল্প বা ওষুধ শিল্পের দিকে তাকালে দেখা যায়, সফল ব্যবসায়ীদের সিংহভাগই ক্যারিয়ারের প্রথম ১০-১৫ বছর অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করে খুঁটিনাটি শিখেছেন। অর্থাৎ, তাত্ত্বিক জ্ঞান বা তারুণ্যের উদ্দীপনার চেয়ে ‘ইন্ডাস্ট্রি নলেজ’ বা পেশাদার অভিজ্ঞতা সাফল্যের দৌড়ে বেশি কার্যকরী। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জটিল অর্থনৈতিক কাঠামোয় টিকে থাকতে হলে কেবল ‘আইডিয়া’ যথেষ্ট নয়। এখানে ব্যবসা করতে প্রয়োজন নেটওয়ার্ক এবং ধৈর্য।
একজন ৪০ বছর বয়সী উদ্যোক্তার যে সামাজিক ও পেশাদার যোগাযোগ থাকে, তা একজন সদ্য গ্রাজুয়েটের পক্ষে থাকা অসম্ভব। বাংলাদেশে লাইসেন্সিং, ব্যাংকিং সুবিধা এবং সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনায় এই নেটওয়ার্কই পার্থক্য গড়ে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, মধ্যবয়সী উদ্যোক্তাদের আর্থিক ব্যাকআপ বেশি থাকে, যা তাদের কঠিন সময়ে টিকে থাকতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেখানে ব্যাংক ঋণ পাওয়া কঠিন, সেখানে ব্যক্তিগত সঞ্চয়ই অনেকের প্রধান ভরসা। তরুণ উদ্যোক্তারা প্রায়ই পুঁজি ব্যবস্থাপনায় ভুল করেন। কিন্তু অভিজ্ঞ পেশাদাররা জানেন কখন খরচ কমাতে হবে এবং কখন বিনিয়োগ করতে হবে।
আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন হিড়িক পড়েছে স্নাতক শেষ হওয়ার পর সিইও হওয়ার। ইনকিউবেশন সেন্টার আর স্টার্ট-আপ গ্রান্টের জোয়ারে অনেক মেধাবী তরুণ কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই ব্যবসায় নামছে এবং কয়েক বছরের মধ্যেই মুখ থুবড়ে পড়ছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে ব্যবসা করা মানেই হলো প্রতিদিন নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা। ড. সুকানলয়া সাওয়াং-এর গবেষণা ভিত্তিক প্রবন্ধে উঠে এসেছে যে, তরুণদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা থাকলেও তাদের ‘ইন্ডাস্ট্রি স্পেসিফিক’ বা নির্দিষ্ট শিল্পখাতে কাজের অভিজ্ঞতার অভাব থাকে।
বাংলাদেশে কি তবে তরুণদের সুযোগ কম?
না, বিষয়টি মোটেও তরুণদের নিরুৎসাহিত করার জন্য নয়। বরং এটি ‘ইন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ’ বা কর্পোরেট উদ্ভাবনের একটি বার্তা দেয়। ইন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ’ (Intrapreneurship) মানে হলো— একটা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে থেকেই উদ্যোক্তার মতো নতুন আইডিয়া আনা, নতুন প্রজেক্ট শুরু করা, আর দায়িত্ব নিয়ে কিছু তৈরি করা। সহজ করে বললে, আপনি কোম্পানির কর্মী, কিন্তু কাজ করেন উদ্যোক্তার মানসিকতা নিয়ে—এটাই ইন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ।
ধরুন, আপনি একটা মিডিয়া হাউসে কাজ করেন। আপনি ভাবলেন—“আমরা যদি তরুণদের জন্য আলাদা ডিজিটাল সিরিজ করি?” আপনি আইডিয়া দিলেন, প্ল্যান বানালেন, টিম নিয়ে কাজ শুরু করলেন। কোম্পানির ভেতরেই নতুন কিছু দাঁড় করালেন— আপনি তখন ইন্ট্রাপ্রেনিউর।
তৈরিপোশাক, ওষুধ বা কৃষিভিত্তিক শিল্পে বাংলাদেশের তরুণ প্রকৌশলী ও ম্যানেজারদের হাতে রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তির জ্ঞান। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকে অভিজ্ঞ উদ্যোক্তাদের হাতে। যদি এসব প্রতিষ্ঠানে কাঠামোবদ্ধভাবে নতুন আইডিয়া পরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে উৎপাদনশীলতা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা—দুটোই বাড়তে পারে। ইন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ এখানে ঝুঁকি কমিয়ে উদ্ভাবনের পথ খুলে দিতে পারে।
বাংলাদেশের স্টার্ট-আপ ইকোসিস্টেমকে আরও শক্তিশালী করতে হলে আমাদের ‘তারুণ্য বনাম অভিজ্ঞতা’র লড়াই বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে স্টার্ট-আপ মানেই অনিশ্চয়তা, অর্থসংকট এবং নীতিগত জটিলতা। তাই তরুণদের জন্য ইন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ হতে পারে একটি ‘ব্রিজ’—যেখানে তারা অভিজ্ঞতার ছায়ায় থেকে উদ্যোক্তা মানসিকতা গড়ে তুলতে পারবে।
এতে করে কয়েক বছর পর তারা যখন নিজের উদ্যোগে নামবে, তখন তাদের হাতে থাকবে বাস্তব অভিজ্ঞতা, নেটওয়ার্ক এবং আর্থিক শৃঙ্খলা। তরুণদের এনার্জি এবং টেকনিক্যাল দক্ষতার সাথে মধ্যবয়সীদের ইন্ডাস্ট্রি জ্ঞান ও নেটওয়ার্কের মেলবন্ধন ঘটাতে হবে। ব্যাংক ও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত কেবল তরুণদের পেছনে না ছুটে অভিজ্ঞ পেশাদারদের উদ্যোগেও সহজ শর্তে অর্থায়ন করা।
স্টিভ জবস ২১ বছর বয়সে অ্যাপল শুরু করলেও তার জীবনের শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবন ‘আইফোন’ এসেছিল ৫২ বছর বয়সে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও তাই—আমাদের অভিজ্ঞ পেশাদাররা যখন উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবেন, তখনই হয়তো আমরা গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডের সত্যিকারের সফল ব্যবসা দেখতে পাব।